Breaking News

ব্রিটিশ ও পাকিস্তান শাসনের পর স্বাধীন বাংলাদেশেও চা-শ্রমিকরা শ্রমদাস,নেই তাদের প্রাপ্য মজুরি

ব্রিটিশদের রেল লাইন বসানোর চিন্তা এদেশের মানুষের জন্য নিঃসন্দেহে এক যুগান্তকারী সংযোজন ছিল।সেই কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের অধিকাংশই বাংলার বাইরে থেকে আনা হয়। প্রধানত বিহার, মধ্যপ্রদেশ, উড়িস্যা এবং অন্ধ্রপদেশ থেকে এই শ্রমিকদের আনা হয়। রেল বসানো শেষ হলে সেই শ্রমিকদের একটা বড় অংশ দেশে না ফিরে এই বাংলাতেই থেকে যায়।

আরও কিছু পরে সেই শ্রমিকদের সাথে আরো ‘বাইরের’ শ্রমিক এনে পাঠিয়ে দেয়া হয় সিলেট-অসম অঞ্চলে। সেখানে জঙ্গল কেটে সাফ করে চা-বাগান বানানো হবে। ব্রিটিশরা সে সময় শুধুমাত্র চা-বাগান বানানোর চিন্তা থেকেই চা বাগানের গোঁড়াপত্তন করেনি। এর সাথে জড়িয়ে ছিল জঙ্গলঘেরা পাহাড়ী এলাকায় বসতি তৈরি করা।এসকল বাগানের চা-পাতা দিয়ে চা বানিয়ে হাট-বাজারে তা বিনামূল্যে মানুষকে খাওয়াত বৃটিশরা। আরো কিছু কাল পরে প্রতিটি হাট বাজার থেকে শুরু করে বিভিন্ন রেল স্টেশনে, লঞ্চ-স্টিমার ঘাটে চায়ের বিজ্ঞাপন ঝুলতে থাকে সর্বত্র। সেই বিজ্ঞাপনে লেখা থাকত-‌”ইহাতে নাই কোনো মাদকতা দোষ,ইহা সেবনে চিত্ত হয় পরিতোষ”। বিজ্ঞাপনে ছবিসহ দেখানো হয় কিভাবে চা বানাতে হয়, চায়ে কি মেশাতে হয় এবং সর্ব প্রথম এক কাপ চায়ের দাম ধরা হয় ১ পয়সা!

বৃটিশ ম্যানেজারেরা শিখিয়ে গেছে কিভাবে দাসপ্রথার মতো চা শ্রমিকদের শাসন ও শোষণ করতে হয়,ঠিক সেই ধারা বজায় রয়েছে এখনও। ব্রিটিশ চলে যাওয়ার পর চা-বাগানের মালিকানা আসে পাকিস্তানি পুঁজিপতিদের হাতে। ইস্পাহানী, বাওয়ানী, কাশ্মীরী পরিবারের হাতে। মালিকানার বদল হলেও ‘সিস্টেম’ বদলালো না। পাকিস্তান আমলেও চা-শ্রমকিদের সেই ব্রিটিশ নিয়মই পালন করতে হত। সারা দিন অমানুষিক খাটনির পর সন্ধ্যে হলে মালিকদের তাবেদার-গোমস্তারা মদের পসরা সাজিয়ে বসত। অসহায় শ্রমিক সারা দিন কাজ করে যা পেত তার সিংহভাগই ওই মদের ভাটিতে শেষ করে আসত।

কালক্রমে পাকিস্তান বিদায় হয়ে বাংলাদেশ হল,বঙ্গবন্ধু চা শ্রমিকদের নাগরিকত্ব প্রদান করলেও তাদের আর কোন সুযোগ সুবিধা এখন পর্যন্ত কোন সরকার দেয়নি,তাদের জন্য দেনদরবারও কোন সরকার করতে দেখা যানি।তাই অন্য অনেক কিছু বদলালেও চা-শ্রমিকদের নিয়তি বদলালো না। অংকের হিসেবে পারিশ্রমিক সামাণ্য বাড়লেও তাদের সঙ্গে করা ব্রিটিশ এবং পাকিস্তানি মালিক-ম্যানেজারদের করা আচরণের সামান্যতম পরিবর্তন ঘটল না। শেষ পর্যন্ত চা-শ্রমিকরা মেনেই নিল সবকিছু। তারা অত সব পরিবতর্ন-টরিবর্তন বোঝেনি। কেবল দেখেছে পাকিস্তানি বা বিহারী ম্যানেজারের বদলে ইংরেজি-বাংলা বলা ম্যানেজার।

বাংলাদেশের চা শ্রীলংকান চায়ের চেয়ে এগিয়ে থাকায় বাংলাদেশের গর্বিত নাগরিকগণ নিজেদের বিশ্বসেরা চায়ের গর্বিত যোগানদার ভেবে গর্ববোধ করলেও ওই চা-বাগানে যুগের পর যুগ কাজ করে যাওয়া হতভাগা মিশ্র জাতির, মিশ্রভাষার মানুষগুলোকে নিয়ে কেউ ভাবেনা।বাগানে চাগাছ বছরের পর বছর যত্ন করে কুঁড়ি থেকে বড় করে তোলেন চা শ্রমিকরা।পাতা ছেঁড়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ে পরিশোধিত চা দেশ-বিদেশে পাঠানোর সিংহভাগ কৃতিত্ব তাঁদের। অথচ সেই শোধনকৃত চা পানের কোনো আর্থিক সংগতি নেই চা শ্রমিকদের।

চা শ্রমিকরা বাগান থেকে ছিঁড়ে কাঁচা চা পাতা লবণ-পানিতে গুলে তা পান করছেন। এত অগ্নিমূল্যের চাপাতা কিনে খাওয়ার সাধ্য তাঁদের নেই। পরিশোধিত চা খেতে নয়, তা মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার জন্যই সৃষ্টিকর্তা তাঁদের জন্ম দিয়েছেন বলে নিজেকে প্রবোধ দেয় চা-শ্রমিকরা।

নোয়াপাড়া,পারকুল,নালুয়া,বৈকণ্ঠপুর,রেমা,সাতছড়ি,চান্দঁপুর ও বিভিন্ন চা বাগানের শ্রমিকরা জানেন চা বাগান শ্রমিকদের ইতিহাস মানে বঞ্চনার ইতিহাস। তাঁদের বছরের পর বছর ধরে সমাজ থেকে আলাদা করে রাখা হয়েছে। অধিকাংশ শ্রমিকই জানেন না তাঁদের ন্যায্য অধিকার কী। অন্যদিকে বাইরের কোনো সংগঠনকে চা বাগানের ভেতর কাজ করতে দেওয়াহয় না। এমনকি এনজিওর কর্মীদের চা বাগানে ঢুকতে গেলে পূর্বানুমতি লাগে। ফলে বাগানের শ্রমিকরা অধিকার আদায়ের সংগ্রামে পিছিয়ে আছেন। যুগ যুগ ধরে বাইরের সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক কর্মীদের জন্য চা বাগান একটি নিষিদ্ধ স্থান করে রাখা হয়েছে।তার মূল কারন যদি চাশ্রমিকের সন্তানরা শিক্ষিত হয়ে যায় তাহলে বাগানে আর কাজ করবেনা,তারা চালাক হয়ে যাবে।নাম মাত্র মূল্যে শ্রমিকও তখন পাওয়া যাবেনা।

সেই সব চায়ের পেটি মৌলবি বাজার, শ্রীমঙ্গল, হবিগঞ্জ, লংলাটি-গার্ডেন, ফিনলে টি-গার্ডেন থেকে চলে আসে চিটাগাং। এখানে নিলাম হয়। সেই নিলাম কেনে দেশের নব্য এলিট সিন্ডিকেট গ্রুপ অব কোম্পানি। তার পর তাতে চেকনাই, জেল্লা আর রূপ-রস মিশিয়ে সেলুলয়েডে কিংবা স্ক্রিনে ফুটে ওঠে ‘অমুক চা, আসল চা’। ‘এর দানা চারপাশ থেকে ছড়ায়।

বাগানের মালিকদের সহযোগিতায় অবাধে লাইসেন্স যুক্ত মদের পাট্টা রয়েছে প্রা, প্রতিটি বাগানে। যার মাধ্যমে চা বাগানগুলোতে দেশীয় বাংলা মদ ছড়িয়ে দেওয়া হয়। শুধু লাইসেন্সই নয়, চা বাগানের জন্য বিভিন্ন মাত্রার মদেরও প্রচলন করা হয়েছে। উত্তরাধিকার সূত্রে চা শ্রমিকরা কোনো সহায়-সম্পত্তি পায় না কিন্তু পায় মদ্য পানের অভ্যাস। যাঁদের চাহিদা মেটানোর জন্যই বেশি করে মদ বিক্রির বৈধ লাইসেন্স দিয়েছে! বাহ! কিঅপূর্ব পরিসেবা!

সহজ-সরল শ্রমিকদের শোষণ করে বাগানের মালিকরা বর্তমানে কোটিপতি ও শিল্পপতি। একজন শ্রমিক প্রতিদিন ৮০ কেজি কাঁচাপাতা তুলতে পারেন। যা থেকে ২৮ কেজি পরিশোধিত চাপাওয়া যায়। এ চা দেশে-বিদেশে বিক্রি করে প্রায় ১০ হাজার টাকা আয় করেন বাগানের মালিকরা।অথচ একজন শ্রমিক প্রতিদিন পাচ্ছে মাত্র ১০২ টাকা এবং সপ্তাহ শেষে সামান্য রেশন।

এমনকি রেমার প্রবেশ মুখে খোয়াই নদী পাড়াপাড় হতে কোন টাকা প্রয়োজন নাহলেও যে মাঝি থাকে তাকে ৮/৯ ঘন্টা টানা ডিউটি করিয়ে মাত্র ১০২ টাকা দেয়া কতটা অমানবিক তা না বলাই ভাল।

চা শ্রমিকরা অত্যন্ত সরজ সরল।তাদের চাওয়া-পাওয়ার সীমানা খুব ছোট।তাদের ছেলে মেয়েরা সুযোগ সুবিধার বাহিরে থেকেও অনেক ক্ষেত্রে সফল হচ্ছে।আমাদের ভাই-বোনদের জন্য আমরা বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক রেখে পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট করানোর চেষ্টা করি।কিন্তু মাত্র ১০২ টাকা ও সামান্য রেশন পাওয়া একজন চা শ্রমিক চাইলেও তাদের সন্তানদের টিউশনি পড়ানোর সুযোগ নেই।তবুও এসকল চা শ্রমিকরা অনেক ভাল রেজাল্ট করছে।খেলাধুলার ক্ষেত্রেও চা শ্রমিকরা অত্যন্ত ভাল করছে।পিছিয়া পড়া এই জনগোষ্ঠীর মেয়েরা ফুটবল খেলায় অসাধারণ কৃতিত্ব অর্জন করেছে।জেলা পর্যায়ে বয়সভিভিক যে কিশোরী ফুটবল দল রয়েছে সেটাতে চুনারুঘাট ও মাধবপুরের চাবাগানের মেয়েদের নিয়েই গঠিত।

এর অন্যতম বড় কৃতিত্ব এফআইভিডিবি(FIVDB) এনজি’র। “ইউনিসেফ বাংলাদেশের” অর্থায়নে ২০১৩ সাল থেকে চা বাগানের শিশুদের উন্নয়নের জন্য কাজ করে গেছে এফআইভিডিবি(FIVDB)।এর মাধ্যমে পিছিয়া পড়া এই কিশোরীদের কিশোর-কিশোরী সংগঠন গঠন করে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা করে তাদের স্কিল বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে।পাশাপাশি প্রতিটি কিশোর-কিশোরী সংগঠনের ছেলে-মেয়েদের ফুটবল সহ বিভিন্ন খেলাধুলোর ব্যবস্থা করত এফআইভিডিবি।এই আয়োজন গুলোর মাধ্যমেই জীবন কালেন্দি,শিপ্রা সাওতাল,,রিংকু রেলী,সুপেন সাওতাল,সুরভী রায়,মনি রাজঘর সহ চুনারুঘাট ও মাধবপুরের অনেক কিশোর-কিশোরী ফুটবলের মাধ্যমে জেলা পর্যায়ে ও উপজেলা পর্যায়ে সুনাম কুড়িয়েছে। চা শ্রমিকের সন্তান অনেকেই এই দরিদ্রা পরিবার থেকেও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ারও সুযোগ পেয়েছে।আকাশ নাইডু শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে অত্যন্ত মেধাবী একজন ছাত্র।

চা বাগান পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী থেকে অনেক কষ্ট করে পড়াশুনা করে যেমন প্রফেসর ডা: আর আর কৈরি’র মতো দেশ সেরা অর্থোপেডিক সার্জারী ডাক্তার তৈরি হয়েছেন তেমনই সত্য নারায়ণ নাইডু দিপু তাতীদের মতো পড়াশুনা শেষ করে এনজিও’তে ভালো অবস্থানেও আছেন।অনেকে সরকারি চাকুরীতেও কর্মরত আছেন।চা বাগানের মানুষজনের সবচেয়ে বড় গুণ তারা অত্যধিক সৎ ও কর্মঠ হয়।

তাই সরকারের প্রতি অনুরোধ আমাদের দেশে সাধারন জনগনের মতো ন্যায্য অধিকার পাওয়ার নিশ্চয়তা তৈরি করেদিন।।।।

সৈয়দ সুহেল রানা,
সচেতন নাগরিক ও লেখক।

About Syed Suhel Rana

Check Also

দেশে ৬টি খাতকে ‘শিশুশ্রম মুক্ত’ ঘোষণা

প্রতিদান ডেস্কঃ দেশের রেশম, ট্যানারি, সিরামিক, গ্লাস, জাহাজ প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং রপ্তানিমুখী চামড়াজাত দ্রব্য ও পাদুকা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!