Breaking News

যুক্তরাষ্ট্রে আগামী ৭১ দিন কি অস্থির যাবে

প্রতিদান ডেস্কঃ

নির্বাচনে পরাজয়ের পর প্রশাসনকে নিজের দাবির পক্ষে কাজে বাধ্য করছেন,কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করে নেতৃত্ব শূণ্যতা তৈরির আশঙ্কা ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া বিলম্বিত হলে অস্থির হয়ে উঠতে পারে বাইডেন শিবির!

প্রশ্ন এখন এটি নয় যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতা ছাড়ছেন কিনা? বরং প্রশ্ন হচ্ছে, ক্ষমতা হস্তান্তরের পথকে কতটা কঠিন করে তুলবেন তিনি? ক্ষমতা ছাড়ার আগে তিনি প্রতিশোধপরায়ণতা থেকে কতটা বিপর্যয়, অস্থিরতা তৈরি করবেন?

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচনের ফল মানতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অস্বীকৃতি ও একের পর এক বিভ্রান্তিমূলক টুইট বলে দিচ্ছে, আগামী ৭১ দিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভীষণ রকমের অস্থির হতে যাচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন পরাজিত একজন হলেও মার্কিন প্রেসিডেন্সির ওপর তাঁর কর্তৃত্ব আগামী ২০ জানুয়ারি দুপুর পর্যন্ত থাকছে। একই সঙ্গে রিপাবলিকান দলের ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণও থেকে যাচ্ছে। কারণ, পরাজিত হলেও তাঁকে ৭ কোটি লোক ভোট দিয়েছেন। ফলে তাঁর হাতে এই দিনগুলোতে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা থাকছে, যা তিনি সাধারণ জীবনে ফেরার আগে অস্থিরতা তৈরির কাজে ব্যবহার করতে পারেন।

এরই মধ্যে ট্রাম্পের এই ক্ষমতার অপব্যবহারের কিছু নিদর্শন দেখা যাচ্ছে। প্রেসিডেন্টের ইচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দিয়ে মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল গতকাল সোমবার সরকারি আইনজীবীদের ভোট জালিয়াতির অস্পষ্ট অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছেন। অঙ্গরাজ্যগুলো নির্বাচনের ফল চূড়ান্ত করার আগেই এই তদন্ত চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপের কারণে ভোটের ফল ট্রাম্প প্রশাসন উল্টে দিতে পারে বলে এক ধরনের আশঙ্কা এরই মধ্যে তৈরি হয়েছে। যদিও প্রেসিডেন্টের দাবির মতোই উইলিয়াম বারের নেওয়া পদক্ষেপের ক্ষেত্রেও ভোট জালিয়াতির অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ হাজির করা হয়নি। এই পদক্ষেপের প্রতিবাদে নির্বাচন অনিয়ম ও অপরাধ-সংক্রান্ত শীর্ষ আইনজীবী এরই মধ্যে পদত্যাগ করেছেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনে থাকা কিছু ব্যক্তির ওপর খড়্গহস্ত হচ্ছেন। এই ব্যক্তিরা তাঁর প্রশাসনের ভেতরে থেকে তাঁর পক্ষে কাজ করেননি বলে মনে করেন তিনি। এরই মধ্যে ট্রাম্প তাঁর প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক এসপারকে বরখাস্ত করেছেন। কারণ, তিনি প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার প্রতি নিবেদিত নন। ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, এসপারের আশঙ্কা, ট্রাম্প এবার সিআইএ পরিচালক জিনা হাসপেল ও এফবিআই পরিচালক ক্রিস্টোফার রেকে বরখাস্ত করবেন। তাঁদের অপরাধ, তাঁরা ট্রাম্পের ইচ্ছার চেয়ে বেশি মূল্য দিয়েছেন জাতীয় নিরাপত্তাকে।

মার্ক এসপারের বরখাস্তের ঘটনা বলে দেয়, আগামী কয়েক দিনে নিজের ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলোর কতটা ক্ষতি করতে পারেন। অস্থিরতা তৈরির জন্য তিনি এটি করতে চান। একই সঙ্গে ক্ষমতা গ্রহণের পর বাইডেনের শুরুর দিনগুলো যেন কঠিন হয়, তা নিশ্চিত করতে চাইছেন ট্রাম্প।

এ বিষয়ে ডেলাওয়্যার অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস কুনস সিএনএনকে বলেন, ‘সত্যি কথা বলতে, তিনি অনেক ক্ষতি করতে পারেন। গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি সংস্থাকে অস্থির করে, শীর্ষ পদে থাকা কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করে নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি করতে পারেন তিনি।’

এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও যা করতে চাইছেন, তা হলো রিপাবলিকান ভোটারদের মনে বাইডেনের মনে একটা স্থায়ী সন্দেহ ঢুকিয়ে দেওয়া। ভোট গণনা শেষ না হলেও যেসব অঙ্গরাজ্যে বাইডেন জয়ী হয়েছেন বলে পূর্বাভাস এসেছে, সেখানে আক্ষরিক অর্থেই ট্রাম্পের পক্ষে ভোটের ফল যাওয়া অসম্ভব। এটা ট্রাম্প ও তাঁর প্রচার শিবিরও ভালো করে জানে। কিন্তু তারপরও তারা ভোট জালিয়াতির অভিযোগকে সামনে রেখে সংশ্লিষ্ট অঙ্গরাজ্যগুলোয় সভা-সমাবেশ করার পরিকল্পনা করেছে। এর লক্ষ্য একটিই—রক্ষণশীল ভোটারদের মধ্যে বাইডেন ও তাঁর প্রেসিডেন্সিকে বেআইনি হিসেবে প্রতীয়মান করা। নিঃসন্দেহে এটিই হতে যাচ্ছে ট্রাম্পের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক কাজ।

ঐতিহ্যগতভাবে মার্কিন আইন অনুযায়ী বিদায়ী প্রশাসন ক্ষমতার হস্তান্তর ও ভবিষ্যৎ প্রশাসনের কাজকে সহজ করতে একটি বিশেষ বরাদ্দ রাখে। কারণ, যে প্রশাসন আসছে সেও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থেই কাজ করবে। সাধারণত নির্বাচনের প্রাথমিক ফল ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এ বরাদ্দ দেওয়া ও অফিস নতুন করে সাজানোর যাবতীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়। নতুন নির্বাচিত প্রশাসনের পক্ষ থেকে তখন এই কাজকে ত্বরান্বিত করতে একটি দল পাঠানো হয়। একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা ও সামরিক দপ্তরগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন নতুন নির্বাচিত প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক-বেসামরিক বিভিন্ন তথ্য দেওয়া হয়। গোপন কূটনৈতিক নথি ও বিদ্যমান বিভিন্ন ঝুঁকি সম্পর্কে নতুন প্রশাসনকে জানানোর কাজটি করা হয়। একই সঙ্গে নতুন প্রশাসনের সম্ভাব্য কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা ছাড়পত্র তৈরির কাজটিও দ্রুত গতিতে সম্পন্ন করা হয়।

এবারের ক্ষমতা হস্তান্তর আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় জটিল। কারণ, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ মাঝখানে নিয়ন্ত্রণে এলেও শীতের আগে আগে তা আবার যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। রয়েছে অর্থনৈতিক মন্দার বাস্তবতা। এর সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের করা ভোট জালিয়াতির ভিত্তিহীন দাবি তো রয়েছেই। ফলে এখন পর্যন্ত ট্রাম্প নিযুক্ত জেনারেল সার্ভিস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের প্রশাসক এমিলি মারফি ক্ষমতা হস্তান্তর সম্পর্কিত কোনো উদ্যোগ নেননি।

এ বিষয়ে জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও ‘অ্যান ওপেন ওয়ার্ল্ড’ বইয়ের লেখক রেবেকা লিসনার বলেন, ‘আমার মনে হয়, ১৯৩২ সালে মহামন্দার সময়ে হওয়া ক্ষমতা হস্তান্তরের পর এটিই হতে যাচ্ছে মার্কিন ইতিহাসের সবচেয়ে বিদ্বেষপূর্ণ ও বিশৃঙ্খল ক্ষমতা হস্তান্তর। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফল মানতে অস্বীকার করেছেন। ফলে বিদায়ী ট্রাম্প প্রশাসন ভবিষ্যৎ বাইডেন প্রশাসনের কাজকে জটিল করে তুলতে, এমনকি এর ক্ষতি করতে ভেতর থেকে কাজ করার জোর আশঙ্কা রয়েছে।’

জাতীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রেসিডেন্ট কিছু ভয়াবহ পদক্ষেপ নিতে পারেন। ধরা যাক, আফগানিস্তান থেকে তিনি সব মার্কিন সেনার ফিরে আসার নির্দেশ দিলেন কিংবা এশিয়ার পুরো অঞ্চল থেকে মার্কিন উপস্থিতি সরিয়ে নিলেন, তাহলে সেখানে আবার মার্কিন উপস্থিতি তৈরি করাটা বাইডেন প্রশাসনের পক্ষে ভীষণ কঠিন হবে। এ ছাড়া ট্রাম্প নিজের পরিবার ঘনিষ্ঠদের জন্য তাঁর ক্ষমা করার ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারেন। এমনকি বহু অপরাধীকে ক্ষমার সঙ্গে সঙ্গে দায়মুক্তিও দিতে পারেন। এমনটি হলে বড় সংকটে পড়বে মার্কিন বিচার বিভাগ।

এদিকে বাইডেন ও তাঁর প্রচার শিবির ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পরাজয় মেনে নিতে এখন পর্যন্ত সময় দিলেও তা আর কত সময় অব্যাহত থাকবে, তা ঠিক স্পষ্ট নয়। সময় চলে যাচ্ছে। ক্ষমতা হস্তান্তরের মতো জটিল প্রক্রিয়া শুরুতে আর বিলম্ব হলে দ্রুতই অস্থির হয়ে উঠতে পারে বাইডেন শিবির, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে নিঃসন্দেহে।

ক্ষমতা হস্তান্তর বিষয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান অবস্থান আগের যেকোনো প্রশাসনের চেয়ে একেবারে বিপরীত। বারাক ওবামা প্রশাসন ক্ষমতা গ্রহণের সময় পূর্ণাঙ্গ সহযোগিতা পেয়েছিল বিদায়ী জর্জ বুশ প্রশাসনের কাছ থেকে। সে সময়টি ছিল ২০০৮-০৯ সময়ের মন্দার সময়। চার বছর আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ক্ষমতায় আসে, তখন সদ্য সাবেক বারাক ওবামা প্রশাসনের কাছ থেকেও একই সহযোগিতা পান।

ট্রাম্প প্রশাসনের সার্বিক অসহযোগিতা সত্ত্বেও বাইডেনের দিক থেকে গতকাল সোমবার মহামারি মোকাবিলায় প্রথম দিন থেকে কাজ করার লক্ষ্যে প্রথম পদক্ষেপটি নেওয়া হয়। ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে রাজনীতি নয়, বিজ্ঞানই নেতৃত্ব দেবে উল্লেখ করে বাইডেন একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের ঘোষণা দেন। ক্ষমতা গ্রহণের প্রস্তুতি নেওয়ার ক্ষেত্রে বাইডেন অবশ্য এগিয়ে রয়েছেন। কারণ, তাঁর সঙ্গে রয়েছেন মার্কিন প্রশাসনে দীর্ঘদিন কাজ করা অনেকেই। এর মধ্যে রয়েছেন রন ক্যালিনের মতো ব্যক্তি, যিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকাকালে জো বাইডেন, আল গোর ও জ্যাক সুলিভানের চিফ অব স্টাফ ছিলেন, ছিলেন জাতীয় নিরাপত্তা সম্পর্কিত জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা। ক্ষমতা হস্তান্তর জটিল হতে যাচ্ছে ধরে নিয়ে এমন ব্যক্তিদের সমন্বয়ে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে ডেমোক্র্যাট শিবির।

এখন পর্যন্ত গুটিকয় রিপাবলিকান নেতা বাইডেনের জয় মেনে নিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছেন নেব্রাস্কার সিনেটর বেন সাসে, ইউটাহ সিনেটর মিট রমনি, আলাস্কার লিসা মার্কোভস্কি ও মেইন অঙ্গরাজ্যের সুসান কলিনস। অন্যরা এখনো এমন আচরণ করছেন, যেন তাঁদের এখনো যথেষ্ট রাজনৈতিক আশা আছে। সিনেটে রিপাবলিকান নেতা মিচ ম্যাককোনেল নির্বাচনের ফলকে চ্যালেঞ্জ জানানোর সব ধরনের অধিকার ট্রাম্পের রয়েছে বলে সিনেটে দেওয়া এক বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন।

ফলে বোঝাই যাচ্ছে, এরই মধ্যে পরিস্থিতি কতটা জটিল হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতি ক্রমে আরও অস্থির হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। অন্তত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের বক্তব্য ও নানা পদক্ষেপে তাই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

সূত্রঃ প্রথমআলো।

About Syed Suhel Rana

Check Also

ফ্রান্সে মহানবীর ব্যঙ্গচিত্র প্রদর্শনের প্রতিবাদে আজমিরীগঞ্জে বিক্ষোভ মিছিল

হাবিবুর রহমান রিয়াদ, আজমিরীগঞ্জ থেকেঃ ফ্রান্সে মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)কে কটাক্ষ করে ব্যঙ্গচিত্র করে প্রদর্শন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!